Monday, 18 June 2018

ভালো মানুষ

মানুষ সত্যিই বিচিত্র প্রাণী। আমার দেখা মানুষদের মধ্যে ভালো মানুষ খুব কমই দেখেছি। ভালো মানুষের সংজ্ঞাটাও বেশ জটিল। কাউকে ভালো মানুষ বলার মাপকাঠি কী? নেই তেমন কোনো মাপার যন্ত্র যা দিয়ে ভালো মানুষ মাপা যায়। তবুও আমি চেষ্টা করি কিছু কিছু কাজের, ব্যবহারের, মানসিকতার ওপর মানুষকে বিচার করার। এটা যে ঠিক কী তার ব্যাখ্যাও আমার কাছে নেই, তবুও চেষ্টা করি।

বিশেষত আমাদের দেশের যা অবস্থা! কৃষক মরছে, শ্রমিক রোজগার হারাচ্ছে, কর্পোরেট দাদাগিরি বাড়ছে। চারদিকে গাছপালা কেটে নদী নালা বুজিয়ে দিয়ে উন্নয়ন চলছে। এতে সত্যি সাধারণ মানুষের কোনো কিছু এসে যায় না। যে দু একটা প্রতিবাদ চোখে পড়ে সেগুলো দমন করতে রাষ্ট্র গুলি চালায়, জেলে পুরে রাখে। প্রত্যক্ষভাবে দমন পীড়ন তো বটেই, পরোক্ষভাবেও গুণ্ডাবাহিনী কাজে লাগিয়ে দমনন পীড়ন চালিয়ে যায় ক্ষমতার অধিকারীরা।
 সাধারণ মানুষের মনে যাতে প্রতিবাদ না করার মানসিকতা আসে সে জন্য রাষ্ট্র যা যা করতে পারে করে চলেছে। সব দিক থেকেই মানুষকে দাস বানিয়ে রেখেছে।

মানুষ হয়ত তাই এই দাসত্বকে মেনে নিয়েছে। কে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবে? এই ন্যারেটিভগুলোও জোর পাচ্ছে। মানুষের নিষ্ক্রিয়তাকে বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করছে।

ঘুম থেকে উঠে রাতে বিছানায় যাওয়া ইস্তক মানুষ সংগ্রামে লিপ্ত। সংগ্রাম নিজেকে ভালো রাখার। এতে যদি কারুর ক্ষতি হয় হোক, নিজে তো বাঁচব। এই ভাবনা থেকেই মানুষের মনে জন্ম নেয় লোভ! তার চারপাশের গড়ে ওঠা  সমাজ কাঠামো তাকে লোভী মানুষ করে তুলতে কোনো কসুর বাকি রাখে না। মানুষের হয়ত এটা এক ধরণের basic instinct। তবুও মানুষ কী সত্যিই এত অবুঝ? ভালো মন্দ বিচারের ক্ষমতা লোপ পেয়েছে কি মানুষের? ঠিক কী কারণে আজ মানুষ এত লোভী? কেনো? জানি না।

পারিবারিক জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনে মানুষ কত কিছু করে, শুধু নিজের insecure জায়গাটা ঢেকে রাখার জন্য। প্রায় মানুষই কোনো না কোনো জায়গায় নিজেকে insecured অনুভব করে। সমাজ, রাজনীতি সম্পর্কে তার নিজস্ব কিছু ধারণা তৈরি করে নেয়। ভাবে সবাই যা আমিও তা। সবাই চোর, তাহলে আমি ভালো মানুষ হয়ে কী করব? ভালো থাকতে গেলে ভালো মানুষ হওয়াটা মুর্খামি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা তাই বলছে। চেষ্টা করেছি ভালো মানুষ না হওয়ার, পারিনি, মুর্খদের দলেই থেকে গেলাম চিরকাল। তবুও নিজে যে ততটা ভালো মানুষ নই, সে কথা আমার নিজের তৈরি মাপকাঠিতেই ধরা পড়ে মাঝে মাঝে।
প্রচলিত পরিবারের ধারণা থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই এমনটা হয় হয়ত। জানিনা, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা বলে, চাকরি করো, রোজগার করো, টাকা জমাও, বিয়ে করো! আমার কেনো জানি, এসব ঠিক এমনটা করে উঠতে পারিনা। কী হবে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জমিয়ে? কীই বা হবে বড় বড় গাড়ি বাড়ি বানিয়ে? মানুষের সাথে যদি মিশতেই না পারি, মানুষের কাজে যদি নাই বা লাগতে পারি! চোখ বন্ধ করলেই চারিদিকে অনাহার, অর্ধাহারে থাকা মানুষের মুখ ভেসে ওঠে। অসহায় লাগে। শিক্ষা বঞ্চিত, স্বাস্থ্য সেবা বঞ্চিত, জীবনের নূন্যতম চাহিদাপূরণে অক্ষম মানুষের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাই। কী আর করা, নিজের দুঃখ, যন্ত্রণা বুকে নিয়েও নিজেকে একটু ভালো রাখার জন্য নূন্যতম যা করতে হয় করি। কষ্ট হয়, তবুও। যেহেতু আমি সমাজের প্রচলিত নিয়ম মতে পরিবারের সম্পদ! আমাকে পরিবারের খেয়াল রাখতে হবে। এখানেও আমি ব্যর্থ। মা, বাবার আশাপূরণে ব্যর্থ, বোনেদের জন্য কিছু করতে না পারার, বিশেষ করে ছোটো বোনের পড়াশোনা/চাকরি ইত্যাদি বিষয়ে আমার পরিবারের মতে আমি একজন ব্যর্থ মানুষ।

ঠিক বুঝতে পারি না। আমার উদাসীনতার জন্যই আমি ব্যর্থ কি না। অথচ তার নাগরিকের পড়াশোনা করানোর দায়িত্ব, চাকরি দেওয়ার, নিরাপত্তা দেবার কথা ছিল রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র শিক্ষার ব্যপারে স্বাস্থ্য সেবার ব্যপারে চূড়ান্ত ব্যর্থ। বুর্জোয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা আজ সব দিক থেকেই ব্যর্থ, এই সাধারণ কথাটা সাধারণ মানুষ কি আদৌ বুঝে উঠতে পারবে? মানুষ কি এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে উদ্যোমি হবে না? যেখানে থাকবে না কোনো শোষণ, কোনো ভেদাভেদ। সেখানে থাকবে শুধু মানুষ। ভালো মানুষ!

No comments:

Post a Comment